কইগো কই গেলা? বলে দরজার কাছ থেকে ডাক দেয় নুপুরের স্বামী সুরুজ আলী।
-এইতো আমি। তুমি কখন আইলা? বলতে বলতে বাথরুম থেকে বের হয়ে আসে নুপুর।
- মাত্রই আইলাম। পুলা কান্দে ক্যান?
-আমারে জিগাও গ্যান। পুলারেই জিগাও।
- একি তোমার মুখ ফোলা ক্যান? তুমি কানতেছিলা নাকি?
-কই নাতো? বলতে গিয়ে নুপুরের মুখ ফর্সা মুখ লাল হয়ে যায়। স্বামীর কাছে সে কিছুই লুকাতে পারে না।
- মাত্রই আইলাম। পুলা কান্দে ক্যান?
-আমারে জিগাও গ্যান। পুলারেই জিগাও।
- একি তোমার মুখ ফোলা ক্যান? তুমি কানতেছিলা নাকি?
-কই নাতো? বলতে গিয়ে নুপুরের মুখ ফর্সা মুখ লাল হয়ে যায়। স্বামীর কাছে সে কিছুই লুকাতে পারে না।
-কই আমি যে দেখতাছি। তোমার কি মন খারাপ? বলতে বলতে নিজের স্ত্রীকে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয় সুরুজ আলী। ছেলে ততক্ষণে কান্না থামিয়েছে একটু।
-তুমি আমারে একদিন ঢাকা নিয়া যাইবা? বিষাদের সুরে বলে নুপুর।
-ক্যান নিমু না? কবে যাইবা? কবে যাইতে চাও?
-তোমার যেদিন কাম থাকবো না। ওইদিন যামু।
-আইচ্ছা ঠিক আছে। সামনের সপ্তায় ছুটি নিমু একদিন। তখন যাইও। যাইতে তো বেশি সময় লাগবো না।
-হ ঠিক আছে।
***
দশ বছর আগের কথা। নুপুর তখন ঢাকায় মনসুরাবাদ আবাসিক এলাকার কাছে এক টিনশেড কলোনীতে মামা-মামীর সাথে থাকত। গ্রামে অভাবের সংসার ছিল। মামা তাকে বাবা মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসে নিজের কাছে। ক দদিন যাবত মেয়েটার শরীর কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। চোখ কালো হয়ে গেছে। খেতে চায় না। মাঝে মাঝে বলে মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। শাহানা ভেবেছে রোদের মধ্যে হেঁটে যেতে গিয়ে মনে হয় এমন হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মী রেহানা এলেন।
শাহানা-আপা নুপুররে একটু দেখবেন।
অনেক ক্ষন দেখার পর।।।
-তুমি আমারে একদিন ঢাকা নিয়া যাইবা? বিষাদের সুরে বলে নুপুর।
-ক্যান নিমু না? কবে যাইবা? কবে যাইতে চাও?
-তোমার যেদিন কাম থাকবো না। ওইদিন যামু।
-আইচ্ছা ঠিক আছে। সামনের সপ্তায় ছুটি নিমু একদিন। তখন যাইও। যাইতে তো বেশি সময় লাগবো না।
-হ ঠিক আছে।
***
দশ বছর আগের কথা। নুপুর তখন ঢাকায় মনসুরাবাদ আবাসিক এলাকার কাছে এক টিনশেড কলোনীতে মামা-মামীর সাথে থাকত। গ্রামে অভাবের সংসার ছিল। মামা তাকে বাবা মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসে নিজের কাছে। ক দদিন যাবত মেয়েটার শরীর কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। চোখ কালো হয়ে গেছে। খেতে চায় না। মাঝে মাঝে বলে মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। শাহানা ভেবেছে রোদের মধ্যে হেঁটে যেতে গিয়ে মনে হয় এমন হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মী রেহানা এলেন।
শাহানা-আপা নুপুররে একটু দেখবেন।
অনেক ক্ষন দেখার পর।।।
রেহেনা আপা-কেমনে বলি তোমারে? আবার না বলেও পারতেছি না।
-কি হইছে আপা?
-নুপুরের পেটে বাচ্চা আসছে। বিশ্বাস না হলেও ঘটনা সত্যি। আমি পরীক্ষা করে দেখছি। কেমনে হইল এইসব?
শুনেই শব্দ করে কেঁদে ওঠে শাহানা। ‘হায় হায় এ কি সর্বনাশ হয়ে গেল’?
-শাহানা নিজেকে সামলাও। তোমার এই অবস্থায় এমন ভেঙ্গে পড়লে চলবে না।
স্বামীর সাথে খোলামেলা আলাপ কর এই সমস্যা নিয়ে। নুপুরের বয়স অল্প। না জানি কিভাবে এই ভুল করে বসল। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। কপালে চিন্তার রেখা ফুঁটিয়ে বললেন রেহানা, নুপুরের এখন প্রায় চার মাস চলে।
-কিছু করা যায় না আপা? বাচ্চা নষ্ট করে ফেলা যায় না? ওর মামা জানলে যে কি করব আমি বুঝতেই পারতাছি না।
-এখন আর ওসব চিন্তা করে লাভ নেই শাহানা। অনেক দেরী হয়ে গেছে। এখন আর বাচ্চা নষ্ট করা যাবে না। তাছাড়া নুপুরের বয়স অনেক কম। এখন বাচ্চা নষ্ট করলে হয়ত ও আর কোনদিন মা হতে পারবে না। মেয়েটার লাভের চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশী হয়ে যাবে শাহানা।
-বুঝছি আপা। আমার নিজের পেটেও বাচ্চা আছে। আমি বুঝতাছি। বলে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে শাহানা।
-কোন পরামর্শ লাগলে আমি আছি।
***যেই আদরের ভাগ্নিকে কখনও বকা দেননি, স্ত্রীর কাছে এই ঘটনা শুনে দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে নুপুরকে কয়েকটি চড় দেন।
মামার পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে সব ঘটনা খুলে বলে। গার্মেন্টসে যাবার পথে এক নির্মানরত বাড়ির সাইট ম্যানেজার দীপক পাল নামক এক লোকের খপ্পরে পড়ে নুপুরের আজ এই অবস্থা। যেখানে নরনারীর শারীরিক সম্পর্কের কোন কিছু নুপুরের জানা ছিল না, সেখানে সন্তান জন্মাবার ইতিবৃত্ত তার কাছে অজানা রহস্যের মতই ছিল। ছেলেটি তাকে প্রেমের ছলনা করে ফুসলিয়ে এই সর্বনাশ করেছে। পরদিন মামা দীপকের খোঁজে যায় কিন্তু কোথাও খুঁজে তার আর কোন হদিস পাওয়া গেল না।
নুপুর পড়ে গেল মহা সমূদ্রে। নিজের শরীরের মধ্যে অন্য একটা অস্তিত্ত্ব বেড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। সমাজের যার কোন স্বীকৃতি নেই। সমাজের কাছে যে শুধু একটা অবৈধ, জারজ শিশু মাত্র।
সারাদিন মেয়েটার এখন কান্নাকাটি করে দিন যায়। মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। সারাক্ষণ মনে হয় আত্মহত্যা করে। মামী অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে নজরে নজরে রাখে।
এরই মধ্যে শাহাবুদ্দিন তার স্ত্রী আর ভাগ্নি কে নিয়ে মনসুরাবাদ এর বাসা ছেড়ে চলে গেল। এইবার উঠলো এক বস্তিতে। যেখানে সন্দেহ করার মত কেউ নেই। মেয়েটা অন্তত ক’টা দিন একটু স্বস্তিতে থাকুক।
নুপুরের মুখের দিকে তাকানো যায় না। চোখ গর্তে চলে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে শরীরে আর কিছু নেই। ঘরের থেকে বের হয় না। ঘরের বাইরের সব কিছুই তার কাছে নরকের মত মনে হয়। দিন গুনতে থাকে কবে এই নরক যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পাবে। দীপকের লালসার শিকার হয়ে নিজের পরিণতির অপেক্ষা করতে থাকে হতভাগী মেয়েটা।
***
-খালা! ও খালা!
-কেডা? বলতে বলতে প্রৌঢ়া এক মহিলা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
-আমি খালাশাহাবুদ্দিন
-কি হইছে শাহাবুদ্দিন মিয়া?
-খালা একটু আমার ঘরে আসেন। নুপুরের ব্যথা উঠছে।
-কই তাই নাকি? কই চল দেখি।
নুপুর মরার মত পড়ে থাকে। শারীরিক যন্ত্রণা ওকে তেমন স্পর্শ করে না। প্রসব বেদনার মত ভয়াবহ কষ্টকেও নিজের মধ্যে হজম করে নেয়। নয় মাসের এই ধকল ছোট্ট এই মেয়েটাকে যেন অনেক পরিণত করে দিয়েছে। মনে মনে ভাবতে থাকে, কি করবে সে এই সন্তান দিয়ে? কিভাবে মানুষ করবে? কি পরিচয় থাকবে? ভাবতে ভাবতে চোখের কোনা দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। মামী পাশে বসে চোখ মুছিয়ে দেয়। একসময় নুপুরের কিশোরী শরীর বিদীর্ণ করে বেরিয়ে আসে একটি পুত্র সন্তান। নুপুর একটি বারের জন্য তার চিৎকার শুনতে পায় বেহুশ হবার আগে। মাত্র একটিবারের জন্যই।
নুপুরকে জানানো হয় যে তার একটি মরা ছেলে হয়েছে। নুপুর কোন উচ্চবাচ্য করে না। ঘটনা অন্তরালেই থেকে গেল। অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা আর মানসিক চাপে নুপুরের মনে হল ও পাগল হয়ে যাবে। ভোরবেলা মামী একগ্লাস দুধ নিয়ে নুপুরের কাছে বসে। নুপুর উঠে বসে অনেক কষ্ট করে। জিজ্ঞাসা করে, মামী বাচ্চাটা কোথায়?
-তোমার মামা খালারে দিসে। উনি ফালাইয়া দিসে।
-ফালাইয়া দিসে? বলেই নুপুর মামীর বুকের উপরে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে-কান্দিস না নুপুর। তোর একসময় বিয়া হইব। তখন তোর আবার বাচ্চা হইব।
-আমি ওরে দেখুম মামী। আপনি আমারে লইয়া চলেন।
-তুই কি পাগল হইলি রে নুপুর?
-না মামী আপনি আমারে লইয়া চলেন। বাচ্চাটারে একবারের জন্যিও দেখলাম না।
-তোর মামা শুনলে রাগ করব নুপুর।
- করুক রাগ। আমার আর আছে কি? আমি একবারের জন্য দেখতে চাই। আপনি আমারে লইয়া চলেন। কই ফেলছে?
-গলির শেষ মাথার প্লটের ধারে নিয়া ফালাইছে।
-মামী বাচ্চা নাকি মরা হইসে? আমি কিন্তু একবার কান্নার শব্দ শুনছিলাম।
নুপুরের এই প্রশ্নের উত্তরে শাহানা নিশ্চুপ থাকে। বুক চিরে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে তার। নুপুর কে খাট থেকে উঠায়ে দাঁড় করায়। নুপুরের মাথা টলতে থাকে কিন্তু তবুও সে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। সেও যে মা! তাকে তো দাঁড়াতেই হবে। শীতের সকাল। নুপুর গায়ে মামীর দেয়া শালটা জড়ায়ে নেয়।
গলির শেষ মাথার প্লটের ধারে খোলা যায়গায় নুপুর আর শাহানা এসে দাঁড়ায়। দেখে কয়েকজন মানুষের জটলা। শাহানা বলে, ‘আল্লা’র দোহাই লাগে। কাউরে বুঝতে দিস না যে বাচ্চাটার তোর। লোকে জানলে ঝামেলা করব’।
নুপুর মাথা কাৎ করে সায় জানায়। জটলার কাছে গিয়ে শুনতে পায় লোকে বলাবলি করছে-
-আহারে! বাচ্চাটারে লবণ খাওয়াইয়া মারছে।
-হ! হারামির পয়দা না হইলে এমন কইরা কেউ বাচ্চারে মারে?
-কে যে লাশটা দুধের কৌটায় কইরা রাইখা গেছে।
-আহারে! কেমন কইরা মারলো বাচ্চাটারে?
-দেখেন না? মুখ ভরতি লবণ? লবণ দিয়া মারছে।
-বাচ্চাডারে কি করুম?
-এইখানেই গর্ত কইরা মাটি চাপা দেই।
-হ এইটাই ঠিক হইব। কার না কার বাচ্চা কেডা জানে।
লবণ দিয়ে মারার কথা শুনে নুপুরের সারা শরীর শক্ত হয়ে যায়। ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে শেষবারের মত এক ঝলক দেখে নেয় তার নাড়িছেড়া ধনকে। ঘাসের উপরে ফেলে রাখা এতটুকু একটা বাচ্চার লাশ। শীতে নীল হয়ে গেছে শরীর। পাশে বড় একটা দুধের কৌটা। এক ঝলক দেখেই নুপুর সরে আসে। ওখানেই দেখে এক লোক কোদাল নিয়ে এসে মাটি কোপাতে শুরু করে। এক মহিলা একটা ছেড়া শাড়ির টুকরা দিয়ে বাচ্চাটার শরীর মুড়ে দেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই বাচ্চাটাকে মাটি চাপা দেয়া হল। মানুষকে কবর দেয়ার মত নয়। মরা বিড়াল বা কুকুরকে আমরা যেভাবে মাটি চাপা দেই সেভাবে। নুপুরকে একরকম জোর করে ধরে শাহানা নিয়ে আসে। নুপুর এমন শক্ত দেখে শাহানা মনে মনে ভয় পেয়ে যায়। মেয়ে যদি কিছু করে বসে আবার? শাহানার বুক কাঁপতে থাকে।
-নুপুর চল বাসায় যাই।
-আপনি যান আমি আমি যামু না।
-যাবি না মানে?
- হ মামী। আমি আর শহরে থাকুম না। গেরামে মার কাছে চইলা যামু।
-যাবি পরে যাইস। তোর শইল ভালা না।
-না মামী। আমি অখনই যাব। আমার আর শইল। সব শেষ হইয়া গেছে। আমি তো এখন বাজারের নটী বেটি হইয়া গেছি।
-তুই এইগুলা কি কস নুপুর?
-ঠিকি কই মামী। আমার বালিশের নিচে কয়টা ট্যাকা আছে। আইনা দেন। আমি চইলা যাই। আমার এইখানে আর না থাকলেও চলব।
অগত্যা শাহানা উপায় না দেখে নুপুরের হাতে টাকা গুজে দিয়ে একটা রিক্সা ডেকে তাতে উঠিয়ে দেয়। রিক্সায় উঠার আগে নুপুরকে জড়িয়ে ধরে শাহানা কাঁদে কিছুক্ষণ। নুপুর একটুও কাঁদে না। মামী শিখিয়ে দেয়, কেউ যেন টের না পায়।
***দশ বছর পর***
বিশাল একটা মাটির স্তুপের সামনে নুপুর আর তার স্বামী সুরুজ আলী দাঁড়ায়ে আছে। সুরুজের কোলে তার ছেলে ঘুমিয়ে। জমিটাতে বাড়ি বানানোর কাজ শুরু হয়েছে। নুপুর আতিপাতি করে খুঁজেও জায়গাটা দেখতে পায় না যেখানে তার প্রথম নারী ছেরা ধন তার প্রথম সন্তান সে একটি বারের জন্যও কোলে নিতে পারে নি। মায়ের দুধ খাওয়ার আগে যাকে লবন খেয়ে মরতে হয়েছে।
সব জায়গার মাটি খুঁড়ে ফেলা হয়েছে।
সুরুজ মিয়া -কি দেখতে আইলা?
নূপুর: আমার পোলারে।
-সে তো আমার কোলে ঘুমায়।
সুরুজের কোল থেকে নুপুর বাচ্চাটাকে নিজের কোলে তুলে নেয় আর চোখের একফোটা জল ঝরিয়ে দিয়ে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হ ঘুমাইতাছে। কেউ দুধ খাইয়া ঘুমায় আর কেউ লবণ খাইয়া ঘুমায়’।....
লিখক-অতঃপর প্রেমে
No comments:
Post a Comment